top of page

ঐতিহাসিক এ এফ সালাহ্উদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকার

Updated: 6 days ago


(আবুল ফয়েজ সালাহ্উদ্দীন আহমদ (১৯২৪–২০১৪) ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের ওপর তার লেখা বহু গ্রন্থ এবং প্রবন্ধ রয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘Social Ideas and Social Change in Bengal’, Bangladesh: Tradition and Transformation এবং India, Pakistan, Bangladesh: Perspective on History, Society and Culture বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক (১৯৯১), স্বাধীনতা পদক (১৯৯৯) এবং ২০১১ সালে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ মর্যাদায় ভূষিত করে।

ঐতিহাসিক ও গবেষক ড. ইফতেখার ইকবাল বৈশ্বিকভাবে পরিচিত মুখ। তার রচিত The Bengal Delta: Ecology, State and Social Change, 1840–1943 এবং The Range of the River: A Riverine History of Empire across China, India, and Southeast Asia বই দুটি এনভায়রনমেন্টাল হিস্ট্রি চর্চায় নতুন নজির স্থাপন করেছে। তিনি টাফট ইউনিভার্সিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত Bengali Intellectuals Oral History Project (BIOHP)-এর অংশ হিসেবে ২০১১ সালে এ এফ সালাহ্উদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকার নেন। ঢাকার বনানীতে নেয়া এই সাক্ষাৎকারটিতে কেবল ঐতিহাসিকের ব্যক্তিজীবনই উঠে আসেনি; উঠে এসেছে সমকালীন বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়াবলিও। সাক্ষাৎকারটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ড. ইফতেখার ইকবালের অনুমতিক্রমে প্রকাশ করছে বেঙ্গল ইন্সটিটিউট অব হিস্ট্রি এন্ড আইডিয়াস।)



ইফতেখার ইকবাল:

আপনার জন্ম ১৯২৪ সালে ফরিদপুরে। পরবর্তীতে পড়াশোনার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। দয়া করে আপনার শৈশব সম্পর্কে সংক্ষেপে যদি কিছু বলতেন? ঠিক কী কারণে পড়াশোনার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন?

এ এফ সালাহ্উদ্দীন আহমদ:

আসলে আমি সরাসরি কলকাতায় যাইনি। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বদলি হতেন। তাই ম্যাট্রিক পর্যন্ত আমি বেশ কয়েকটি স্কুলে পড়েছি।

ই. ই.:

আপনি কোন কোন স্কুলে পড়েছেন?

সা. আ.:

প্রথমে পড়েছি পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জিলা স্কুলে। তবে আমি কোনো কিন্ডারগার্টেন বা প্রি-স্কুলে যাইনি; পড়াশোনা শুরু হয়েছিল বাড়িতেই। পরিবারে বড় ছেলে ছিলাম। তখনকার দিনে কলকাতায় বাড়িতে গৃহশিক্ষক রাখার রেওয়াজ ছিল, যাকে বলা হতো ‘তালভেইল’ (Talveil/লজিং) ব্যবস্থা। এখন এমন জিনিসের কথা শোনা যায় না। আসলে তখনকার দিন ছিল অন্যরকম প্রাচুর্যের। আমার বাবা খুব উঁচু পদে ছিলেন না, আয়ও খুব বেশি ছিল না, কিন্তু জীবন মোটামুটি ভালোই চলত।

ই. ই.:

আচ্ছা, জীবনযাত্রার মান বেশ ভালো ছিল।

সা. আ.:

আমরা জেলা শহরে থাকতাম। বাড়িঘরও বড় ছিল, লোকজনও বেশি ছিল না। বাবা কলেজের কিছু সিনিয়র ছাত্রকে আমাদের বাড়িতে রাখতেন, যারা ভালো পরিবার থেকে আসত কিন্তু হোস্টেলে থাকতে পারত না। তিনি তাদের সাহায্য করতে চাইতেন।

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

বাঁকুড়ায় তিনি এরকম একজনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তার নাম কাজী হাসপতুল্লাহ। তিনি বাঁকুড়া কলেজে বিএর ছাত্র ছিলেন। ইংরেজি ও বাংলা খুব ভালো জানতেন। নামে কাজী থাকার কারণে তিনি প্রায়ই বলতেন যে তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আত্মীয়। এখানে এসেছেন বার্মা থেকে। সেটা হতেও পারে। তিনি আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। আমার ইংরেজি এবং বাংলার প্রাথমিক শিক্ষা তার কাছেই হয়েছিল। তিনি ছিলেন উদারপন্থী। তার কিছু চিন্তাভাবনা আমার খুব ভালো লাগত।

আর আমার বাবা-মায়ের কথাও বলতে হয়। বিশেষ করে আমার মা কোনো স্কুলে না পড়লেও শিক্ষিত মানসিকতার ছিলেন। তার বিবেকবোধ, জোরালো ব্যক্তিত্ব, শক্তিশালী চরিত্র এবং ন্যায়-অন্যায়ের বোধ খুব ভালো ছিল। তিনি ছিলেন বাবার চেয়ে অনেক বেশি ধর্মভীরু। বাবা কখনো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন না; দুই ওয়াক্ত পড়তেন। তিনি ছিলেন হাসিখুশি ও নির্ভার মানুষ; জাগতিক ব্যাপারে খুব বেশি টান ছিল না। তার বন্ধুদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু। বাঁকুড়া হিন্দু-প্রধান অঞ্চল। আমার মায়ের বন্ধুরাও অনেকে হিন্দু ছিল। তবে বাবা নিয়মিত অফিসে যেতেন। অফিসের সময় ছিল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা। তাই তিনি একটু দেরিতে উঠতেন। গোসল-নাস্তা সেরে বেরোনোর আগে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়তেন। কিন্তু তখন আসলে আর নামাজের সময় থাকত না। বুঝতেই পারছেন, সূর্য ওঠার অনেক পরে তিনি এটা করতেন।

ই. ই.:

হ্যাঁ।

সা. আ.:

তারপর নাস্তা করে অফিসে যেতেন। আর সন্ধ্যাতেও খুব কড়াকড়ি নিয়মে কিছু করতেন না। সন্ধ্যায়ও তিনি একই কাজ করতেন। অফিস থেকে ফিরে তিনি নামাজের জন্য বসতেন, ব্যাস ওই পর্যন্তই। জুমা বা অন্যান্য নামাজের জন্য খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। ছোটবেলা থেকেই আমি এসব দেখেছি। তার বন্ধুদের মধ্যে হিন্দু ছিল, মুসলমান ছিল। এমনকি খ্রিস্টান পাদ্রিদের সঙ্গেও তিনি গল্প করতে পছন্দ করতেন। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন সুফি-স্বভাবের, খুবই উদার মানুষ।

আর আমার মা ছিলেন এক অসাধারণ নারী। তিনি বাংলা ও উর্দু খুব ভালো জানতেন। নিয়মিত নামাজ পড়তেন। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, তখন আমার বয়স আট-নয় বছর হবে। সেই বয়সেই তিনি আমাকে কোরআনের কাহিনি, পুরনো কিসসা, চিরায়ত গল্প শোনাতেন। আমি যেহেতু প্রথম সন্তান, আর আমার বোনের জন্ম হয়েছিল পাঁচ বছর পরে, তাই আমি মাকে অনেক বেশি কাছে পেয়েছি। আমাদের সঙ্গে বাবার এক চাচাতো ভাইও থাকতেন, বয়সে আমার চেয়ে দুই-তিন বছরের বড়। তিনি আর আমি মায়ের কাছ থেকে নামাজ পড়া শিখেছিলাম। মায়ের গ্রামের এক মহিলার কাছেই আমি কোরআন খতম করি।

একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আমি আজও মনে রেখেছি। তখন আমি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। নামাজ পড়া শিখছি কেবল। আরবি দোয়ার অর্থ ঠিকমতো বুঝতাম না। বাঁকুড়া জিলা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে রবীন্দ্রনাথের একটি প্রার্থনামূলক কবিতা ছিল। বাঁকুড়া জিলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় হেডমাস্টারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল আমাকে। তিনি আমাকে দেখে বললেন, “ওকে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দিন, ও একটু এগিয়ে আছে।” আমি ছোটবেলা থেকেই বেশ মনোযোগী ছিলাম। আমাদের বাংলা বইয়ের নাম ছিল ‘সাহিত্য চয়ন’। প্রথম অংশে গদ্য, দ্বিতীয় অংশে কবিতা। আর কবিতা অংশের প্রথম কবিতাটি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সেটি ছিল একটি প্রার্থনা। পরে জেনেছিলাম, সেটি ছিল আসলে ব্রাহ্ম কথা।

ই. ই.:

ও আচ্ছা, ব্রাহ্ম…

সা. আ.:

হ্যাঁ, ব্রাহ্ম কথা। “বল দাও, মোরে বল দাও।” যেমনটা বলছিলাম, আমাদের বাড়িতে যে গৃহশিক্ষক থাকতেন তিনি নিজেও একজন কবি ছিলেন। আমাকে সাহিত্য পড়তে খুব উৎসাহ দিতেন। এই প্রার্থনাটা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কারণ তখন আমি মায়ের কাছে নামাজ পড়া শিখছি, আর ঠিক সেই সময় এই কবিতা পড়লাম। আমার মনে হলো, “রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ…”-এর চেয়েও রবীন্দ্রনাথের এই প্রার্থনাটি যেন আরও সুন্দর। আমি মনে মনে ভাবলাম, নামাজের শেষে ওই দোয়ার বদলে রবীন্দ্রনাথের এই প্রার্থনাটাই পড়ি না কেন? তারপর সত্যিই আমি তা করতে শুরু করলাম। এখনো মনে আছে, তখন আমার বয়স নয় বা দশ। আমি প্রার্থনাটি মনে মনে পড়তাম। কিছুদিন পর ভাবলাম, বিষয়টা মাকে বলা উচিত। মায়ের সঙ্গে আমার বন্ধুসুলভ সম্পর্ক ছিল। একদিন মাকে বললাম, “মা, আমি ওই দোয়ার বদলে এই কবিতাটা পড়ছি।”

মা আমার দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, “তাতে ক্ষতি কী?” তারপর আমার হাত চেপে ধরে বললেন, “বাবা, আমি তোমাকে যা ভালো লেগেছে, তা-ই শিখিয়েছি।”

ঘটনাটা আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। আমি সেভাবেই চালিয়ে গেলাম। এরপর দুই-তিন-চার বছরের মধ্যে আমার আর কড়া ধর্মবিশ্বাস রইল না। বই পড়ে নয় বরং নিজের ভেতর থেকেই কিছুটা যুক্তিবাদী হয়ে উঠলাম। আমার ভাবনাটা ছিল এমন—ভালো হও, ভালো কাজ করো; সেটাই আসল কথা। আর এটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। পরবর্তীতে যখন আমি নিয়মিত নামাজ পড়া ছেড়ে দিলাম, তখন অনেকে মায়ের কাছে নালিশ করতেন, “আপনার ছেলে তো নামাজ পড়ে না।” কেউ কেউ মজা করে বলতেন, “ছেলেটা বুঝি হিন্দু হয়ে গেছে!” আমি বলতাম, “না, না, আমি হিন্দু হইনি। আমি চাইলে মাকে খুশি করার জন্য নামাজ পড়তে পারি, কিন্তু আল্লাহকে খুশি করার জন্য নয়।”

ই. ই.:

হা হা হা!

সা. আ.:

মা তখন হেসে বলতেন, “না, আমাকে খুশি করার জন্যও তোমাকে নামাজ পড়তে হবে না।” এই ছিল আমাদের পরিবারের পরিবেশ। আর বাবা তো এসব নিয়ে কখনোই মাথা ঘামাতেন না।

ই. ই.:

এই সময়ের কাছাকাছি আপনি রিপন কলেজে যান?

সা. আ.:

না, না। বাঁকুড়া থেকে আমরা বিষ্ণুপুরে যাই। তারপর সেখান থেকে বাবা তিন মাসের ছুটি নিয়ে আমাদের নিজ জেলা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন আমরা ফরিদপুরে যাই এবং কিছুদিন সেখানে থাকি। ফরিদপুরে গিয়ে আমার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন হলো। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া আর বিষ্ণুপুরে আমাদের ধর্মীয় রীতিনীতি বা আচার নিয়ে কেউ কিছু বলত না। তখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে সরকারি জেলা স্কুলে ভর্তি হলাম।

ফরিদপুরে বাবা যখন আমাকে নিয়ে গেলেন, আমাদের বাড়িটা জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। আমরা সেখানে তিন মাস ছিলাম। এই সময়ের মধ্যে বাবা আবার বদলি হলেন। আমি সেখানে কিছুদিন পড়াশোনা করি। আমার খালা এবং অন্যান্যরা আমাদের সঙ্গে থাকতেন। আমি ফরিদপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হই। তখন ১৯৩৫ সাল। গিয়ে দেখলাম, পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। সরকারি হাই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন একজন হিন্দু ভদ্রলোক। স্কুলটি সরকারি হলেও আমি সেখানে একধরনের সাম্প্রদায়িক প্রবণতা টের পাই। আমরা ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কথা বলি। সবকিছুর দালিলিক প্রমাণ হয়তো সবসময় পাওয়া যায় না, কিন্তু দৈনন্দিন ব্যবহারে তার ছাপ ছিল। পরে ফিরে তাকিয়ে সেটা আরও স্পষ্টভাবে বুঝেছি।আমার অভিজ্ঞতাটা বেশ অদ্ভুত ছিল। রশিদ নামে আমাদের একজন মুসলমান ক্লাস-টিচার ছিলেন। পুরো নামটা এখন মনে নেই। তিনি জোর দিয়ে বলতেন, মুসলমান ছাত্রদের ক্লাসে টুপি পরে আসতে হবে। আমরা তখন হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যেতাম। কিন্তু তার জেদ ছিল, আমার ক্লাসের প্রত্যেক মুসলমান ছাত্রকে টুপি পরতেই হবে। এটা আমাকে খুব অবাক করেছিল। অনেকে আবার অন্য মুসলমান ছাত্রের কাছ থেকে টুপি ধার করে আনত।

আরেকটা ঘটনা বলি। একদিন জানানো হলো, আমাদের রেলস্টেশনে যেতে হবে। কেন? ঢাকার নবাব বাহাদুরকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। তিনি নাকি মুসলিম লীগ সংগঠিত করার জন্য ফরিদপুর সফরে এসেছেন। স্কুল চলাকালীন সময়েই কয়েকজন লোক এলো। আমাদের মধ্যে কয়েকজনকে রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হলো। অবশ্য প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। তিনি আমাদের যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। সেখানেই আমি প্রথম ওই তথাকথিত নবাবকে দেখি। খুব ফর্সা একজন মানুষ, কিন্তু তিনি ঠিকমতো বাংলাও বলতে পারতেন না। তিনি বলছিলেন, “আমি বলতেছে... যে আপনাদের ভালো করবে আমি।” শুনে আমার বেশ মজা লেগেছিল।

পরে বুঝেছি, কিছু মুসলিম কর্মকর্তার কাছে গিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য উসকে দেওয়াটা ছিল একটা সূক্ষ্ম নীতি। এই প্রবণতা সেখানে আগে থেকেই ছিল। তবে এতে আমার নিজের চিন্তাভাবনায় বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। কারণ আমি সেখানে মোটে এক বছরের মতো ছিলাম। তারপর বাবা আবার বদলি হলেন। তখন তাকে ‘টোডাঙা’ নামের জায়গার কাছাকাছি এক মফস্বল শহরে পোস্টিং দেওয়া হলো। সেখান থেকে পরে কলকাতার ব্যারাকপুরে বদলি হন। তবে আমরা থাকতাম দমদম জংশনে, কলকাতার খুব কাছেই। বাবা প্রতিদিন সকালে ট্রেনে করে যাতায়াত করতেন। সেখানে আমাদের বড় একটা বাড়ি ছিল। আমি তখন কুমার আশুতোষ ইনস্টিটিউশনে পড়তাম।

ই. ই.:

নামটা আরেকবার বলবেন?

সা. আ.:

কুমার আশুতোষ ইনস্টিটিউশন। ওহ, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। বাঁকুড়া থেকে যখন আমি বিষ্ণুপুরে গিয়েছিলাম, সেখানে আমি ছিলাম একমাত্র মুসলমান ছাত্র। তখন ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে আমাদের দ্বিতীয় ভাষা নিতে হতো। সেখানে আরবি বা ফারসি ছিল না, তাই আমি এক বছর সংস্কৃত পড়া শুরু করি। পরে ফরিদপুরে গেলে সেখানে আরবি ছিল বটে, কিন্তু অনেক অগ্রসর স্তরে; ফলে সেটা আমি নিতে পারিনি। আবার যখন কলকাতার কাছে এলাম, সেখানেও আমি ছিলাম একমাত্র মুসলমান ছেলে। ফলে আমার সামনে ছিল হয় সংস্কৃত, নয় আরবি। তারপর বাবা আবার কলকাতায় বদলি হলেন। সেখান থেকে আমার শিক্ষাজীবনে এক নতুন পর্ব শুরু হয়।

ই. ই.:

তাহলে আপনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে গিয়েছিলেন ত্রিশের দশকের শেষ দিকে?

সা. আ.:

হ্যাঁ, ১৯৩৬–৩৭ সালের দিকে।

ই. ই.:

আর প্রায় সেই সময়েই কি আপনি রিপন কলেজে ভর্তি হন?

সা. আ.:

না। তো আমি যা বলছিলাম। তখন আমরা কলকাতার এন্টালি মার্কেট বলে এক জায়গায় থাকতাম। কাছেই ছিল একটি পুরোনো স্কুল। তালতলা হাই স্কুল নামের একটি বেসরকারি স্কুল। আমি সেখানে ভর্তি হই এবং সেখান থেকেই ম্যাট্রিক পাস করি। সেখানে বিশেষ করে দ্বিতীয় ভাষা নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। আমার সামনে ছিল সংস্কৃত বা আরবি, এই দুটির একটি। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই উর্দু শিখেছিলাম। আমার মা দিল্লি এবং অন্যান্য জায়গায় থাকায় উর্দু জানতেন। তখন আমাদের সুযোগ ছিল; যাদের মাতৃভাষা বাংলা, তারা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে উর্দু নিতে পারত। আবার যাদের মাতৃভাষা হিন্দি বা বাংলা, তারাও উর্দু নিতে পারত।

আমাদের ক্লাসে কয়েকজন হিন্দু ছাত্র ছিল, যাদের মাতৃভাষা ছিল হিন্দি। সিং নামের একজন ছাত্র ছিল, যার কথা আমার ঠিক মনে নেই। সে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে উর্দু নিয়েছিল। আর আমি ছিলাম দ্বিতীয় ছাত্র যার মাতৃভাষা ছিল বাংলা, কিন্তু দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নিয়েছিলাম উর্দু। যখন আমরা ক্লাসে গেলাম, মৌলভি সাহেব দেখলেন, আমরা মাত্র দুজন ছাত্র। তখন আমাদের বারান্দায় বসতে দেওয়া হলো। কিছুদিন পর আমরা বুঝলাম, উর্দুতে আমরা বেশ পারদর্শী। তাই আমাদের শেখানোর মতো তেমন কিছু ছিল না। আমরা উর্দু এত ভালো জানতাম যে আমাদের আর দরকার পড়েনি…

ই. ই.:

ওটা তো পারিবারিক ভাষার মতো ছিল।

সা. আ.:

হ্যাঁ। তো আমরা যেটা করতাম, আমি ওই ক্লাসে হিন্দি শিখতাম, মৌলভি সাহেব বসে থাকতেন আর বলতেন “পড়ে যাও নিজেরা।” এভাবেই আমি হিন্দি শিখি। আর আমি তাকে বাংলা শেখাতাম। এইভাবেই সময় কাটত। তারপর রিপন কলেজ খুব দূরে ছিল না, তাই…

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

তো যেটা বলছিলাম। রিপন কলেজ কেন, অন্য কোথাও কেন নয়? কারণ আমি প্রথম বিভাগে পাশ করেছিলাম। চাইলে প্রেসিডেন্সি কলেজেও যেতে পারতাম। কিন্তু আমার বাবা এসব জাগতিক বিষয় নিয়ে খুব একটা ভাবতেন না। তখন তিনি খুব অসুস্থও ছিলেন। আর আমি ছোটবেলা থেকেই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতাম। কিছু বন্ধু বলল, “চলো, এখানে ভর্তি হই।” কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়ও তখন প্রায় শেষ। তাছাড়া আমি দেখলাম, ব্যস্ত এলাকার মধ্যে কলেজটি খুব ভালো। কয়েকজন অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। বাংলায় আমাদের ছিলেন প্রমথনাথ বিশী।

ই. ই.:

প্রমথনাথ বিশী!

সা. আ.:

হ্যাঁ। ইংরেজিতে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু।

ই. ই.:

দারুণ তো!

সা. আ.:

হ্যাঁ, বিষ্ণু দে-ও ছিলেন। ইতিহাসে ছিলেন হীরেন মুখার্জি। তারা সবাই ছিলেন বড় মাপের মানুষ, খুবই পরিচিত নাম।

ই. ই.:

এই বড় বড় ব্যক্তিত্বদের কারো সঙ্গে কি আপনার কোনো কথাবার্তা বা যোগাযোগ হয়েছিল?

সা. আ.:

না, তেমন নয়। আমরা তো কেবল ছাত্র ছিলাম। দূর থেকে তাদের শ্রদ্ধা করতাম, মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। বলতে গেলে সমাজতন্ত্রের প্রতি আমার ঝোঁকটা তখন থেকেই শুরু হয়।

ই. ই.:

রিপন কলেজ থেকেই?

সা. আ.:

হ্যাঁ। আসলে তখন থেকেই আমি এ বিষয়ে বই পড়তে শুরু করি।

ই. ই.:

আপনি কি কোনো বইয়ের কথা মনে করতে পারেন, যেটা পড়েছিলেন?

সা. আ.:

না। ওই যে বললাম, বাঁকুড়ায় থাকার সময় থেকে যখন আমি রবীন্দ্রনাথ পড়তাম...

ই. ই.:

হ্যাঁ।

সা. আ.:

ওই কবিতাটাসহ আরও অনেক কবিতাই আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। যেমন আরেকটি কবিতা আছে, ‘দুই বিঘা জমি’। এই কবিতাটি আমাকে নানা কারণে খুব প্রভাবিত করেছিল। প্রথমত, দেশপ্রেমের ধারণা, বুঝতেই পারছেন। একেকজন একেকভাবে প্রভাবিত হয়। সবার ক্ষেত্রে না হলেও এই বিশেষ কবিতাটি আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল। যেমন, সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার অনেক আগেই কবিতাটি আমাকে ভাবিয়েছিল। এই যে ধনীদের দ্বারা গরিবদের শোষণ। আছে না—


“এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি—

রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।”


ই. ই.:

হ্যাঁ, এটা তো খুব সমাজতান্ত্রিক ধারণা।

সা. আ.:

এই শোষণ যে কতটা খারাপ, এই ভাবনাটা...

ই. ই.:

হ্যাঁ, শোষণের ধারণাটা খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

সা. আ.:

গরিব মানুষের প্রতি আমার সহমর্মিতা ছিল। দেশের প্রতিও ছিল ভালোবাসা।

ই. ই.:

ঠিক।

সা. আ.:

আর এটাও বলতে হয় যে আমার ওই গৃহশিক্ষকের সঙ্গে নজরুল ইসলামের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল।

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

আমার জীবনের এই গড়ে ওঠার সময় আমাকে প্রভাবিত করেছে অনেকভাবে। ওদিকে তখন, সাম্প্রদায়িক মনোভাবও ক্রমশ বাড়ছিল।

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

এটা আমার পরিবারকেও প্রভাবিত করেছিল। পরিবারের কিছু সদস্য ছিলেন সাম্প্রদায়িক মনোভাবের। কিন্তু আমার বাবা তেমন ছিলেন না। আমার বাবার এক কাকা সম্ভবত ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বড় কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি এসব বিষয়ে খুব জড়িত ছিলেন। সেসময় আমার বাবা-মা এসব পছন্দ করতেন না। তিনি ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেটা মুসলিম লীগের আগের দিকের একধরনের সংগঠন ছিল।

ই. ই.:

আবদুল লতিফ…?

সা. আ.:

না, আমির আলি।

ই. ই.:

হ্যাঁ, আমির আলি, দুঃখিত।

সা. আ.:

আবদুল লতিফ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না।

ই. ই.:

তিনি মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি তৈরি করেছিলেন।

সা. আ.:

মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি কিছুটা রক্ষণশীল ছিল। আমির আলি আধুনিক চিন্তার মানুষ হলেও তিনি এক ধরনের পৃথকতাবাদী মনোভাব পোষণ করতেন। সাম্প্রদায়িক মনোভাব তখন কতটা প্রবল ছিল, তা বোঝা যায়। বলছিলাম, আমার বাবার এক কাকা ছিলেন। আমরা তাকে ‘দাদা’ বলতাম। আমি তখন খুব ছোট, ক্লাস ফোরে পড়ি। তিনি উর্দুতে কথা বলতেন। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “বল বেটা, বল—গান্ধী চোট্টা, দেশ বান্দর সি. আর. দাস।” আমি তার দিকে তাকালাম, তার কথাবার্তা আমার একদম ভালো লাগেনি। আমি সেখান থেকে সোজা দৌড়িয়ে বাবার কাছে গেলাম। বাবাকে বললাম যে তিনি আমাকে এসব কথা বলতে বলেছেন। বাবা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, না, না, কখনো এসব বলবে না। তারা খুব ভালো মানুষ। অর্থাৎ পরিবারের একজন সদস্য খুব নোংরা ভাষায় কথা বলছিলেন, আর আমার বাবা বলছিলেন—না, এভাবে বলা যাবে না।

কারণ তখন আমরা দুটো পত্রিকা পড়তাম। এর মধ্যে একটি ছিল দ্য স্টেটসম্যান, আরেকটা অমৃতবাজার পত্রিকা। সেই সময় থেকেই পত্রিকা পড়ার মাধ্যমে আমরা ইংরেজি শিখতাম। তো যেটা বলছিলাম, রিপন কলেজে তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু কমিউনিস্টরা খুব সক্রিয় ছিল। একদিন হঠাৎ করেই ক্লাসরুমে ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ পেয়ে গেলাম।

ই. ই.:

কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো ইংরেজিতে ছিল, নাকি বাংলায়?

সা. আ.:

না, না, ইংরেজিতে।

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

এই ধরনের বিষয়গুলো। সেখানে শ্রমিকদের ঐক্যের কথা ছিল।

ই. ই.:

দুনিয়ার মজদুর এক হও!

সা. আ.:

হ্যাঁ, সেরকমই। তারপর নিজ থেকেই এসব বই পড়া শুরু করলাম। তখনও কারো সঙ্গে সেভাবে পরিচয় হয় নাই। পরে, ১৯৩৮ সালের দিকে, লাইব্রেরিতে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির রজনী পাম দত্তের কিছু লেখা পেলাম। যাই হোক, কারও প্রভাব ছাড়াই আমি নিজের একান্ত আগ্রহে এইসব সাহিত্য পড়ছিলাম। তখনকার কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গেই আমার জানাশোনা ছিল না; আমি সম্পূর্ণ খোলা মনে, একজন উদারপন্থী ও যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবেই এগুলো পড়তাম। আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আমাকে কখনোই টানেনি। ১৯৩৮ সালের ওই সময়টায় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে যাওয়াটা আমার একটা শখে পরিণত হয়েছিল। আমার বাবা-মা এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। আমি হেঁটে হেঁটে ঘুরতাম, চারপাশ দেখতাম, আর সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক সভায় গিয়ে বসতাম। একদিন জানলাম, এম. এন. রায় নামে একজন বিখ্যাত নেতা আসছেন। কলকাতায় তখন একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ছিল…

ই. ই.:

আপনি এম. এন. রায়ের কথা বলছেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ। তখন তার প্রতি আমার খুব আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

ই. ই.:

আপনি তাঁকে কোথায় দেখেছিলেন?

সা. আ.:

আমি তার সঙ্গে দেখা করিনি। তাকে কলকাতায় ১৯৩৮ সালে দেখেছিলাম।

ই. ই.:

প্রেসিডেন্সি কলেজে?

সা. আ.:

না। প্রেসিডেন্সি কলেজে আমি অনেক পরে যাই।

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

তখন আমি রিপন কলেজের ছাত্র, মাত্র প্রথম বর্ষে পড়ি। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটু বলা দরকার। মুসলিম লীগ তখন নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছিল। মুসলিম লীগ আগেই ছিল, কিন্তু তখন তার পুনরুজ্জীবন হচ্ছিল। জিন্নাহ ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে ১৯৩২–৩৩ সালের দিকে মুসলিম লীগকে সংগঠিত করেন। তিনি প্রায় একাই মুসলিম লীগকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিলেন। তখন মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী অনুভূতি—

ই. ই.:

খুব জোরালো হয়ে উঠছিল।

সা. আ.:

হ্যাঁ। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যেও মুসলিম জাতীয়তাবাদী অনুভূতি খুব প্রবল ছিল। মওলানা আজাদ ছাড়াও আরও অনেক সচেতন মুসলমান ছিলেন। আমি এসব সভায় যেতাম। ড. সৈয়দ হোসেন নামে একজনের কথা আমার মনে পড়ে। তিনি ফজলুল হকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি বহু বছর আমেরিকায় ছিলেন। নেহরু পরিবারের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁকে নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত ছিল। যাই হোক, তিনি ছিলেন একজন সাংবাদিক। পরে তিনি আমেরিকায় চলে যান। ১৯৩৮ সালে, কিংবা হয়তো ১৯৩৭ সালে, তিনি কলকাতায় আসেন এবং একটি সভায় বক্তৃতা দেন। আমি সেই সভায় গিয়েছিলাম। তিনি পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, কিন্তু দৃঢ়ভাবে কংগ্রেসপন্থী ছিলেন। তিনি আলবার্ট হলে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। পরে সেটাই ইন্ডিয়া কফি হাউস হয়। তিনি খুব সুদর্শন ছিলেন। কংগ্রেস ও গান্ধী সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

ই. ই.:

কংগ্রেস ও গান্ধী?

সা. আ.:

হ্যাঁ। তিনি একটি বইও লিখেছিলেন। Gandhi: The Saint and the Statesman। আমি বইটি কিনেছিলাম। এরপর ধীরে ধীরে আমি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের দিকে আকৃষ্ট হতে থাকি। তারপর সরোজিনী নাইডুর কথাও বলতে হয়। সেটা সম্ভবত ১৯৩৭ সালের কথা, আমি তখন ছাত্র। তিনিও আলবার্ট হলে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই সময় কংগ্রেসের ভেতরে ভারতের রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নিয়ে একটা বিতর্ক চলছিল। কেউ কেউ চাইছিলেন হিন্দি হোক। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে এর প্রবল বিরোধিতা হয়। তারা হিন্দি চায়নি। ভারতে ভাষা-বিতর্ক পাকিস্তানের ভাষা-আন্দোলনের অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। ১৯৩৭–৩৮ সালেই বিষয়টি খুব গুরুতর হয়ে উঠেছিল। আমি মনে করি, সরোজিনী নাইডু আলবার্ট হলে একটা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আমি সেটা লিখে রেখেছিলাম এবং আজও আমার মনে আছে, “একটি জাতির ভাষা সেই জাতির হৃদয়। মানুষের ভাষা মানুষের আত্মা। পৃথিবীর কোনো শক্তি, কোনো সরকার জাতীয় ভাষাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।”

ই. ই.:

ঠিক।

সা. আ.:

ভাষার প্রশ্নে কোনো জাতীয় বিতর্ক হওয়া উচিত নয়। মানুষের মুখের ভাষাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রভাষা। সরোজিনী নাইডুর এই বোধটুকু ছিল, যা জিন্নাহর ছিল না, আর সে কারণেই নানা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। যাই হোক, আমি যেটা বলছিলাম। আমি তখন এ ধরনের সভাগুলোতে যেতাম, যার বেশিরভাগই ছিল কংগ্রেসের সভা। ১৯৩৮ সালের কথা বলি, তখন সবে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। টাউন হলে তখন কংগ্রেসের সভাপতি সুভাষ বসু আর মুসলিম লীগের সম্পাদক আসলামউদ্দীন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আন্দামান বন্দীদের মুক্তির দাবি তোলা হয়েছিল। আমি সেই সভায় উপস্থিত ছিলাম। এসব কথা এজন্য বলছি যে, আমার তরুণ বয়সে আমি সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলাম না, কিন্তু রাজনীতির প্রতি আমার একটা টান তৈরি হয়েছিল। আমি রাজনৈতিকভাবে খুব সচেতন হয়ে উঠছিলাম। আমার এই রাজনৈতিক সচেতনতা—

ই. ই.:

জি, আপনি বলুন!

সা. আ.:

—তৈরি হয়েছিল। এরপর যেটা বলছিলাম, আমি তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম, মানে এম. এন. রায়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।

ই. ই.:

আপনি এম. এন. রায়ের সঙ্গে কখন দেখা করেছিলেন? তাঁকে দেখেছিলেন?

সা. আ.:

‘বরণীয় ব্যক্তিত্ব স্মরণীয় সুহৃদ’ বইয়ে আমি এ নিয়ে বলেছি। শামসুন্নাহার মাহমুদ এবং জহুর হোসেন চৌধুরীর একটা লেখার সূত্র ধরে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। ১৯৩৮ সালের কথা। তখন সমাজ দুটো ভাগে বিভক্ত ছিল। মুসলিম সমাজও তখন রক্ষণশীল এবং উদারপন্থী, এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। উদারপন্থীরা মোটামুটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী ছিলেন এবং অনেকেই ছিলেন বামপন্থী। আপনি যদি ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস দেখেন, দেখবেন শুরুর দিকের অনেক কমিউনিস্টই মুসলমান ছিলেন। মুজাফফর আহমদের মতো মানুষ তো সেই সময় থেকেই ছিলেন।

আর এম. এন. রায়ের রাজনৈতিক জীবনের কথা তো জানেনই। ১৯৩০ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। তারপর বোম্বেতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দেয়। তাঁকে ১৪ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছিল, পরে সেটা কমিয়ে ৭ বছর করা হয়। ৭ বছর জেল খাটার পর ১৯৩৭ সালে তিনি মুক্তি পান। জেলে থাকার সময় এম. এন. রায় ছিলেন একজন উদারমনা সমাজতন্ত্রী। তিনি খুব স্বাধীনভাবে চিন্তা করতেন। জেল থেকে বের হওয়ার পর তার মনে হলো, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোকে এক হতে হবে। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন। তিনি বলতেন, সবাইকে কংগ্রেসের পতাকার নিচে আসতে হবে। তার মতে, কংগ্রেস শুধু একটা রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটা জাতীয় মঞ্চ। সকল সমাজতন্ত্রী এবং ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবের মানুষদের এই মঞ্চে যোগ দিতে হবে, যদিও এর নেতৃত্ব তখন প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীলদের হাতে ছিল। সাধারণ মানুষের কাছে যেতে হবে। কারণ বিপ্লব করতে হলে সাধারণ মানুষের মধ্যেই যেতে হবে। তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে, সেখানে নিজের জায়গা তৈরি করতে হবে। তিনি ‘বিকল্প নেতৃত্ব’-এর (Alternative Leadership) স্লোগান তুলেছিলেন। অর্থাৎ, কংগ্রেস জাতীয় মঞ্চ ঠিকই, কিন্তু তার নেতৃত্ব এখনো রক্ষণশীলদের হাতে। তাই আমাদের বিপুল সংখ্যায় সেখানে যোগ দিয়ে এর নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিতে হবে। আমি এসব মনে করতে পারি, কারণ তখন আমি কলকাতায় ছিলাম। এম. এন. রায় ওই সভায় মূলত এই কথাগুলোই বলতে এসেছিলেন। সভাটির সভাপতিত্ব করেছিলেন শামসুন্নাহার মাহমুদ।

ই. ই.:

শামসুন্নাহার মাহমুদ ওই সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ। তখন এম. এন. রায় মুসলমানদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন দুটি কারণে। প্রথমত, তার অসাম্প্রদায়িক সমাজতান্ত্রিক মনোভাবের জন্য। দ্বিতীয়ত, তার বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। তিনি Historical Role of Islam (ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা) নামে একটা ছোট বই লিখেছিলেন।

ই. ই.:

হ্যাঁ, বইটা খুব বিখ্যাত।

সা. আ.:

খুব বিখ্যাত বই। ছোট বই, কিন্তু সেখানে তিনি খুব স্পষ্ট করে কিছু কথা বলেছিলেন। সেসব কথা উচ্চবর্ণ হিন্দুদের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য ছিল না, কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। তিনি সাম্প্রদায়িক মনোভাবের জন্য বর্ণপ্রথাকে দায়ী করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে এর জন্য হিন্দুদেরই দোষ দিতে হয়। প্রায় হাজার বছর ধরে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি থেকেছে কিন্তু বর্ণপ্রথা এবং সামাজিক দূরত্বটা থেকে গেছে। তিনি বলতেন, “আমি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেছি, কিন্তু আমি ব্রাহ্ম সমাজে যাইনি।” তার বক্তব্য ছিল, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে সবাইকে একজোট হতে হবে। কংগ্রেস একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম, এবং মুসলমানদেরও এতে যোগ দেওয়া দরকার। তিনি মুসলমানদের আহ্বান করতেন, তাঁদের অংশগ্রহণ চাইতেন। এই কথাগুলো আমার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যাই হোক—

ই. ই.:

এই ঘটনাটা, মানে সভাটা আরেকটা কারণেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ একজন মুসলিম নারী সেই সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন। আর সেই সময়ে শামসুন্নাহার মাহমুদ—

সা. আ.:

যেটা বলছিলাম, এম. এন. রায়ের বই তাঁকে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় করে তোলে, বিশেষ করে উদারমনা মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে।

ই. ই.:

হ্যাঁ, হ্যাঁ।

সা. আ.:

আর শামসুন্নাহার মাহমুদের ভাই ছিলেন হাবিবুল্লাহ বাহার। ভাই-বোন মিলে তারা বুলবুল নামে একটি পত্রিকা বের করতেন।

ই. ই.:আচ্ছা, হ্যাঁ। নজরুল সম্ভবত সেখানে লিখতেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ, সে সময়ের কবি-সাহিত্যিকরা লিখতেন। তখন খুব জনপ্রিয় কয়েকটি পত্রিকা ছিল। একটি ছিল নাসিরউদ্দীনের সওগাত। সেটা ছিল মূলত সাহিত্যপত্রিকা। তবে মুসলিম সমাজের জাগরণ, নারীশিক্ষা, মুক্তচিন্তার মতো বিষয়ও সেখানে থাকত। বুলবুল ছিল আরও অগ্রসর, আরও উদারপন্থী। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ছিল মোহাম্মদী। অর্থাৎ তিরিশের দশকের শেষ দিকে তিনটি বাংলা পত্রিকা তিন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করত। মোহাম্মদী ছিল খুবই রক্ষণশীল। সওগাত ছিল উদার, কিন্তু সরাসরি রাজনৈতিক নয়। আর বুলবুল সমাজতন্ত্রের কথাও বলত।

ই. ই.:

আরও বেশি র‍্যাডিক্যাল?

সা. আ.:

হ্যাঁ, আরও বেশি র‍্যাডিক্যাল। শামসুন্নাহার মাহমুদও পরে সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। এম. এন. রায়কে যে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, সেটা মূলত এই মুসলিম বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকেই হয়েছিল। বলা যায়, মুসলমানরাই প্রধানত আয়োজনটা করেছিলেন। তো এটাই ছিল আমার প্রথম যোগাযোগ, বলতে পারেন আমার প্রথম…

ই. ই.:

এনকাউন্টার?

সা. আ.:

না, ঠিক এনকাউন্টার বলব না। তখনও আমার নিজের রাজনৈতিক চিন্তা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। তবে আমি কমিউনিস্ট সাহিত্য পড়ছিলাম এবং সম্ভবত কমিউনিস্টদের দিকেই ঝুঁকছিলাম। কিন্তু তখনও আমি খোলা মনেই সবকিছু দেখতাম। যেমন আমি ওই লেখায় লিখেছি। তখন আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ি। সেখানেই জহুর হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। রণজিৎ গুহর সঙ্গেও পরিচয় হয়।

ই. ই.:রণজিৎ গুহর সঙ্গে তখনই আপনার দেখা হয়েছিল?

সা. আ.:হ্যাঁ।

ই. ই.:

জহুর হোসেন চৌধুরীও তখন আপনার সমসাময়িক ছিলেন এবং তারা বামঘেঁষা রাজনীতি করতেন।

সা. আ.:

হ্যাঁ, জহুর হোসেন চৌধুরীও এম. এন. রায়ের লেখা পড়তেন, তার চিন্তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। মূল কথা ছিল, নিজেদের আলাদা করে রাখা যাবে না। যেখানে সাধারণ মানুষ আছে, সেখানেই যেতে হবে। মুসলিম লীগও আরেকটা প্ল্যাটফর্ম। মুসলমানদের এই প্ল্যাটফর্মটাকে তাঁদের হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এটাকেও কাজে লাগাতে হবে।

ই. ই.:

এই ধারণাটাই এম. এন. রায়ের কাছ থেকে আসছে।

সা. আ.:

হ্যাঁ।

ই. ই.:

বিকল্প নেতৃত্ব।

সা. আ.:

হ্যাঁ, সবাই মূলত একই কথাই বলছিলেন। মানে, আগে থেকেই যে প্ল্যাটফর্মটা আছে সেটাকে ব্যবহার করা।

ই. ই.:

বিদ্যমান প্ল্যাটফর্মটাই ব্যবহার করা?

সা. আ.:

হ্যাঁ। এই ভাবনা থেকেই জহুর হোসেন চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, প্ল্যাটফর্মটাকে ভেতর থেকে কাজে লাগাতে হবে। অনেকেই পরে যোগ দিয়েছিলেন এবং আমিও তখন এই আন্দোলনে যুক্ত হই। এর মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধ পুরো রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দিল। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এম. এন. রায় কংগ্রেসের ভেতরে খুব সক্রিয় এবং শক্ত অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু ১৯৩৯ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, কংগ্রেস একটা বেশ অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিল। আপনি তো জানেন, নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুল ভোটে জিতেছিল, এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও (NWFP) কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল। এই ইতিহাস আপনার জানাই আছে। সিন্ধেও মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারেনি। আল্লাহ বখশ কংগ্রেসকে শক্তভাবে সমর্থন করেছিলেন। পাঞ্জাবে ইউনিয়নিস্টরা মন্ত্রিসভা পায়।

শুধু দুর্ভাগ্যবশত বাংলায় বঙ্গীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাবে মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারল না। কারণ ফজলুল হক তখন বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। তিনি কৃষক প্রজা পার্টির নেতা ছিলেন। তিনি সাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন না; বরং ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ নেতা। তিনি বাংলায় হিন্দু-মুসলমান ঐক্য চাইতেন। তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে জোট মন্ত্রিসভা গঠন করতে চেয়েছিলেন। তখন মুসলিম লীগ ছিল তৃতীয় শক্তি। কিন্তু বাংলার কংগ্রেস নেতৃত্বের মধ্যে দুটো শ্রেণি বা ভাগ ছিল। একদিকে শহুরে বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্ত পেশাজীবী—আইনজীবী, ডাক্তার, ব্যারিস্টার। আরেকদিকে ছিল জমিদার শ্রেণি।

কলকাতা শহরের রাজনীতিতে জমিদার শ্রেণির প্রভাব ছিল বেশি। তারা চাইত না ফজলুল হক সফল হন। কারণ ফজলুল হক জমিদারি প্রথা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেটাই ছিল তার কর্মসূচির বড় অংশ। ফলে বঙ্গীয় কংগ্রেস তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল।

এই সুযোগটাই মুসলিম লীগ কাজে লাগাল। তারা ফজলুল হককে আমন্ত্রণ জানাল। ফজলুল হক ছিলেন প্রথাগত একজন রাজনীতিবিদ। তার খুব শক্ত কোনো আদর্শিক অবস্থান ছিল না। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন, ভালো নেতা ছিলেন, কিন্তু কোনো গভীর আদর্শিক অঙ্গীকার ছিল না। তিনি ক্ষমতায় থাকতে চাইতেন। রাজনীতিবিদরা যেমন ক্ষমতা চায়, অনেক সময় ক্ষমতার জন্যই ক্ষমতা চায়। যে তাঁকে সমর্থন করবে, তিনি তার সঙ্গেই জোট বাঁধবেন, এমন একটা প্রবণতা ছিল। তখন মুসলিম লীগ তাঁকে ডাকল। আর কংগ্রেস তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় তিনি কংগ্রেসের ওপর বেশ ক্ষুব্ধও ছিলেন।

ই. ই.:

যখন এসব ঘটছিল, ততদিনে আপনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে গেছেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে। এগুলো আমাদের দেখা হওয়ার আগের সময়ের ঘটনা। আমি এসব ঘটনার সাক্ষী ছিলাম।

ই. ই.:

আচ্ছা, প্রেসিডেন্সি কলেজে আপনার রণজিৎ গুহর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি কি আপনার সহপাঠী ছিলেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ, ১৯৪০ সালে তিনি আমার সহপাঠী ছিলেন। একই ক্লাসে পড়তাম।

ই. ই.:

১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব নিয়ে কি আপনারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ, হ্যাঁ।

ই. ই.:

আপনাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

সা. আ.:

আপনাকে খুব মজার একটা ঘটনার কথা বলি। আমি আমার একটা লেখাতেও এটা উল্লেখ করেছি। আমি কখনোই খুব সক্রিয় র‍্যাডিক্যাল ছিলাম না। তার আগে তখনকার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা একটু বলে নিই। কংগ্রেস তখন বলল, ব্রিটিশরা যদি যুদ্ধের পর ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি না দেয়, তবে আমরা তাদের কোনো সহযোগিতা করব না। এটা এম. এন. রায়ের কাছে খুব অদ্ভুত, বরং অবাস্তব দাবি মনে হয়েছিল। তার কথা ছিল, স্বাধীনতা কখনো থালায় সাজিয়ে দেওয়া হয় না। তিনি বলতেন, সহযোগিতা করলে আমরা নানা সুবিধা পাব, আর সময় হলে ক্ষমতাও আমাদের হাতে আসবে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, ভারত একসময় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসবে।

কমিউনিস্টরা তখন বলছিল, এটা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। কিন্তু এম. এন. রায় বললেন, না, এটা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ নয়। তার মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ; কিন্তু এই যুদ্ধ হলো ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধ। তার কাছে ফ্যাসিবাদ ছিল সাম্রাজ্যবাদের চেয়েও বড় হুমকি। তিনি বলতেন, পুরো বিশ্ব যদি পরাধীন হয়ে যায়, তবে ভারত স্বাধীন থাকতে পারে না; বিশ্ব যদি ফ্যাসিবাদের দখলে চলে যায়, তবে আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারব না। আর তিনি আগেই বলেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানির মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, সেটা সাময়িক। একসময় এটা ভেঙে যাবে। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আজ হোক বা কাল, জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ করবেই। পরে ঠিক সেটাই ঘটল।

কিন্তু ১৯৩৯ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হলো, তখন কংগ্রেস বলল যে তারা এতে নেই। তাঁকে তখন অনেকে বলল, তিনি ব্রিটিশদের সহযোগী, কারণ এটা নাকি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। কিন্তু পরে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর হামলা হলো, তখন কমিউনিস্টরাই বলতে শুরু করল, না, না, এখন এটা জনগণের যুদ্ধ! যাই হোক, সেটা আলাদা প্রসঙ্গ।

দেশের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে এম. এন. রায়ের অবস্থান ছিল, কংগ্রেসের পদত্যাগ করা উচিত নয়। বরং ক্ষমতায় থেকে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করা উচিত। কিন্তু কংগ্রেস পদত্যাগ করল। যার ফলাফল ছিল হতাশাজনক। আর মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম লীগের সমর্থন অনেক বেড়ে গেল। সেটা এক অর্থে স্বাভাবিকই ছিল। ফজলুল হকই আসলে পাকিস্তানে মুসলিম লীগকে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এখন আরেকটা মজার ঘটনা বলি। আমি একটু এলোমেলোভাবে বলছি—

ই. ই.:

না, না, বলুন। আপনি চালিয়ে যান।

সা. আ.:

আমার জীবনকে যেসব ঘটনা গড়ে দিয়েছে, তার মধ্যে কিছু ঘটনা সত্যিই খুব তাৎপর্যপূর্ণ। তখন ছিলাম জহুর হোসেন, আমি এবং কালীঘাটের সত্যনারায়ণ ব্যানার্জী।  তিনি ব্রাহ্মণ পরিবারের ছিলেন, কিন্তু খুব মুক্তমনা। দুটি ঘটনা আমার মনে আছে। আমরা প্রায় প্রতিদিন পার্ক স্ট্রিটে দেখা করতাম। সত্য কালীঘাট থেকে আসতেন। আমরা রজনী মুখার্জী হলে মিলিত হতাম। সত্যর পাশের বাড়ির একজন শ্রমিক নেতা ছিলেন, মিস্টার মিত্র, তিনিও প্রায়ই আসতেন। তো একদিন সত্য প্রস্তাব দিল যে, যেহেতু আমরা মুক্তমনা মানুষ, আমাদের এমন কিছু করা উচিত যাতে প্রমাণ হয় যে আমরা কোনো প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাস করি না। তখন আমাদের বয়স মাত্র আঠারো কি উনিশ বছর। আমি তখন অনার্সের তৃতীয় বর্ষে পড়ি এবং সদ্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছি। সালটা একদম ঠিক ১৯৪১।

না, দুঃখিত, জহুরই বলেছিল, আমাদের একটা অনুষ্ঠান করা দরকার। সেখানে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করব যে আমরা প্রতিষ্ঠিত ধর্মের প্রতি বিশ্বাস ত্যাগ করেছি। আমরা মুক্ত মানুষ, আমরা মানবতাবাদী। মানবতাবাদে ধর্মান্তরিত হতে হলে অবশ্যই…

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

জহুর অর্থনৈতিকভাবে একটু সচ্ছল ছিল। তার বাবা ছিলেন সিনিয়র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। জহুর বলল, চল, একটা হোটেলে যাই। সে আমাকে আর সত্যকে আমন্ত্রণ জানাল। আমরা গেলাম গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে। কনট প্লেসের উল্টো দিকে সেটা এখনো আছে।

ই. ই.:

সেখানে গিয়ে আপনারা কী করলেন?

সা. আ.:

আমরা লাঞ্চ করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে আমাদের যার যার ধর্মের নিষিদ্ধ মাংস আর পানীয়ের অর্ডার দিলাম!

ই. ই.:

মানে, হিন্দু এবং মুসলিম—উভয় ধর্মের জন্যই নিষিদ্ধ এমন কিছু?

সা. আ.:

হ্যাঁ। জহুর আর আমি অর্ডার দিলাম পর্ক চপ (শূকরের মাংস)।

ই. ই.:

আচ্ছা, তখন পর্ক পাওয়া যেত?

সা. আ.:

হ্যাঁ, পাওয়া যেত। গ্রেট ইস্টার্ন ছিল আন্তর্জাতিক মানের হোটেল। তাছাড়া তখন যুদ্ধের সময়, ফলে ওসব সহজেই পাওয়া যেত। দামও খুব বেশি ছিল না। জহুর আর আমি নিলাম পর্ক চপ, আর সত্য ব্যানার্জী নিল বিফ স্টেক (গরুর মাংস)।

ই. ই.:

আচ্ছা! একজন ব্রাহ্মণ হয়ে? বেশ মজার তো!

সা. আ.:

হ্যাঁ, সে একজন ব্রাহ্মণ ছিল। আমরা তিনজনের কেউই ঠিক জানতাম না কী পানীয় নেব। জহুর বলল, “জিন! জিন অ্যান্ড টনিক।” তো আমরা তিনজন সেটাই নিলাম। আমি লেখায় এসব লিখিনি, কারণ—

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

আমরা তিনজন সেই খাবার খেলাম। সত্যি বলতে, খাবারটা আমাদের কারও খুব ভালো লাগেনি। কিন্তু সেটা করা দরকার ছিল।

ই. ই.:

এটাকে এক ধরনের বিদ্রোহ বলা যায়।

সা. আ.:

হ্যাঁ, বিদ্রোহই। ধর্মীয় পরিচয়ের বাঁধন ছেড়ে দিয়ে আমরা মানবতাবাদী হলাম। ব্যাপারটা এক ধরনের রিচুয়ালের মতো ছিল।

আরেকটা ঘটনা বলি, একই মানুষদের নিয়ে। একদিন জহুর আর আমি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ক্লাস শেষে বেরিয়েছি। হঠাৎ দেখি, উল্টো দিক থেকে সত্য ব্যানার্জী আসছে। আমাদের দেখে সে জোরে ডাকতে শুরু করল। তার সঙ্গে ছিল দাড়ি-টুপি আর শেরওয়ানি পরা একজন ভদ্রলোক। তিনি ছিলেন ফরিদপুর থেকে আসা আমাদের এক পার্টি কমরেড। সদ্য বিয়ে করেছিলেন, তাই শেরওয়ানি পরে ছিলেন। সেই সময় আমি ধুতি পরতাম। আমার বেশির ভাগ বন্ধুই ধুতি পরত। শুধু জহুর পায়জামা-শার্ট পরত, কখনো প্যান্ট-ট্রাউজার। তাই আমাদের পোশাক দেখে কেউ বুঝতে পারত না কে হিন্দু আর কে মুসলিম। যাই হোক, সত্য আমাদের ডাকল। বলল, আমাদের বন্ধু, কমরেড হাকিম ভাই এসেছেন। চল, দ্বারিকে গিয়ে চা খাই। হাকিম ভাই ছিলেন আমাদের সিনিয়র। তারপর আমরা গেলাম। জায়গাটার নাম ছিল ‘দ্বারিকের শিঙাড়া’, খুব বিখ্যাত দোকান। দ্বারিক মিষ্টির জন্য খুব নামকরা ছিল, চাও পাওয়া যেত। সত্য আমাদের নিয়ে গেল। সেখানে বারান্দার মতো জায়গায় ছোট ছোট চৌকো টেবিল ছিল। আমরা সবাই গিয়ে বসলাম। একজন বেয়ারা এসে গ্লাসে পানি দিয়ে গেল। সত্য শ্রমিক নেতা ছিল, তাই একটু জোর গলায় কথা বলার অভ্যাস ছিল। সে বলল, “এই চার প্লেট শিঙাড়া আর চা নিয়ে আয় যা!” তারপর আমরা দশ-পনেরো মিনিট গল্প করতে লাগলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, শিঙাড়া আসছে না। ব্যাপার কী? আমি বললাম, “সত্য, আসছে না কেন? কী ব্যাপার? এত দেরি হচ্ছে কেন?” সত্যও বলল, “কী রে, আসছে না কেন?” তারপর দেখি, চৌদ্দ-পনেরো বছরের বেয়ারা ছেলেটা কাউন্টারে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলছে, আর আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কী হলো? কী ব্যাপার?” ছেলেটা কাছে এসে বলল, “স্যার, বাবু আপনাদের তো দিতে কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু একটু অসুবিধা আছে ওই হাকিম সাহেবকে নিয়ে।”

ই. ই.:

হাকিম সাহেব?

সা. আ.:

হ্যাঁ, হাকিম সাহেব। ছেলেটা বলল, “উনার তো দাড়ি আছে—” তারপর সে আমাদের একটা ঘরের দিকে ইশারা করে বলল, “ওই তো দেখেন, স্যার।” আমরা সেদিকে তাকিয়ে প্রথমবার দেখলাম যে লাল কালিতে লেখা আছে—“কেবলমাত্র হিন্দুদের জন্য।”

ই. ই.:

মানে, শুধু হিন্দুদের জন্য।

সা. আ.:

হ্যাঁ, শুধু হিন্দুদের জন্য। তারা আসলে এই নিয়মটাই মানছিল।

ই. ই.:

জায়গাটা কোথায় ছিল যেন?

সা. আ.:

হ্যারিসন রোড আর কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে। এলাকা মোটামুটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল, তবে মুসলমানরাও যেত। আবার পার্ক সার্কাস ছিল মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা। পরে আমরা জানতে পারি, উনিশ শতকের দিকে যখন দোকানটা শুরু হয়, তখন থেকেই নিয়মটা এমন ছিল। তারপর যা হলো, সেটা একেবারে নাটকীয়।

ই. ই.:

হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনারা তো বুঝতেই পারেননি যে এমন কিছু হতে পারে।

সা. আ.:

না, না। আমরা তো কখনো ওই দিকটা খেয়ালই করিনি। যেতাম, খেতাম, চলে আসতাম। কেউ কিছু বলত না। আমরা তো ধুতি আর শার্ট পরা থাকতাম।

ই. ই.:

হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনারা তো আগে থেকেও সেখানে যেতেন—

সা. আ.:

হ্যাঁ। আর সেদিন সত্য ব্যানার্জীই আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। সে-ই অর্ডার দিয়েছিল।

ই. ই.:

তিনি নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়েছিলেন।

সা. আ.:

হ্যাঁ, সে শুধু অবাক হয়নি, ভীষণ রেগে গিয়েছিল। টেবিলে এমন জোরে ঘুষি মারল যে গ্লাস পড়ে গেল। রাগে সে কাঁপছিল। সে নিজেও জানত না যে এমন নিয়ম আছে।

ই. ই.:

হ্যাঁ, বাস্তব ছবিটা তখন সামনে এল।

সা. আ.:

সে এত রেগে গেল যে, শ্রমিক নেতা হিসেবে দাঁড়িয়ে প্রায় বক্তৃতা শুরু করে দিল। সবাইকে গালাগাল করে বলল, “আমি এতদিন বুঝতাম না যে মুসলমানরা কেন পাকিস্তান চায়। এখন আমি বুঝতে পারছি! আমিও পাকিস্তান চাই!” মনে রাখবেন, এটা ১৯৪১ সালের কথা। সে বলল, “আমরা এতদিন বুঝতাম না, তারা কেন পাকিস্তান চায়!”

ই. ই.:

হা হা। “আমিও পাকিস্তান চাই!”

সা. আ.:

তারপর আবার টেবিলে ঘুষি মারল, আরেকটা গ্লাস ভেঙে গেল। তারপর সে চিৎকার করে বলল, “বাস্টার্ড, তোমাদের জন্যই আমাদের আজকে এই অবস্থা হয়েছে! এই লেখা যদি তুমি না সরাও…” দোকানের খুব কাছেই কলাবাগান নামে একটা বস্তি ছিল, বেশ বিখ্যাত জায়গা। সত্য বলল, “আমার কলাবাগানের সব মুসলমান বন্ধুদের ডেকে সব দোকান লুট করিয়ে দেবো!” আমার এখনো মনে আছে এটা ১৯৪১ সালের কথা, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, সত্য ব্যানার্জী এই কথাই বলেছিল, “তোমাদের দোকান লুট করিয়ে দেব।”

ই. ই.:

খুব সাহসী কথা ছিল।

সা. আ.:

হ্যাঁ, কারণ সে তো সারাজীবন ওই এলাকায় হিন্দু হিসেবেই চলাফেরা করেছে। এদিকে ভিড়ও জমে গেল। তখন বেয়ারা ছেলেটা ভয় পেয়ে বলল, “স্যার, বলছি যে আমি কী করব বাবু? আমি তো কর্মচারী। আমি যা যা হচ্ছে সব গিয়ে বলছি।” আমরা তখনও দোকানে দাঁড়িয়ে আছি। তারপর সত্য আমাকে উদ্দেশ্য করে ইচ্ছা করেই জোরে চিৎকার করে বলল, “সালাহ্উদ্দীন, তুমি কাল এসে দেখে যাবে, ওটা সরানো হয়েছে কি না।”

ই. ই.:

হা হা।

সা. আ.:

সে তো নেতা ছিল, বুঝতেই পারছেন। আপনি তো জানেনই এই নেতারা কীভাবে তৈরি হয়।

ই. ই.:

হ্যাঁ, তা তো বটেই।

সা. আ.:

পরিস্থিতি তো অবশ্যই বদলে গিয়েছিল। সত্য বলল, “তুমি কাল এসে দেখবে। আমার বন্ধু কাল এসে দেখে যাবে।” দোকানে যারা কাস্টমার ছিল, তারাও সব দেখছিল। তখন আমি বললাম, ঝগড়া করে লাভ নেই, চল আমরা অন্য কোনো রেস্টুরেন্টে যাই। সত্য তখনও রেগে ছিল, কিন্তু জহুর বলল, “চল যাই।” তারপর আমরা আরেকটা রেস্টুরেন্টে গেলাম, নাম ছিল দিলখুশ। সেখানে এ ধরনের কোনো বাধানিষেধ ছিল না। আমরা সেখানে ফিশ চপ খেলাম। আর জহুর আমাদের সরষে চা খাওয়ালো।

ই. ই.:

তাহলে আর কোনো বিপ্লবী খাবার হলো না! পর্ক ছিল বিপ্লবী খাবার, কিন্তু ফিশ চপ তো একেবারে নিরপেক্ষ খাবার।

সা. আ.:

তবে মজার ব্যাপার হলো, পরদিন সকালে আমি পার্ক সার্কাস থেকে বেরিয়ে ট্রামে আসছিলাম। ট্রাম থেকে নেমে দোকানের সামনে দাঁড়াতেই মনে হলো, ওরা যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমি দোকানের কাছে যেতেই একজন লোক ছুটে এসে বলল, “বাবু, আপনার বন্ধুকে বলে দেবেন, ওটা উঠে গেছে। এখন আর কোনো অসুবিধা নেই।”

ই. ই.:

দোকানের মালিক এসে বলেছিল?

সা. আ.:

না, না, মালিক নয়। ম্যানেজার। মালিক তো বাইরে থাকত।

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

তো সে বলল, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ওটা আর হবে না। আপনারা কবে আসবেন? আর কোনো অসুবিধা নেই। স্যারকে বলবেন।” এইভাবেই সত্য ব্যানার্জী একটা ছোটখাটো সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল। সামাজিক পরিবর্তন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

সত্য ব্যানার্জী এটা করতে পেরেছিল, কারণ সে নিজে হিন্দু ব্রাহ্মণ ছিল। সে হিন্দু সমাজের ভেতর থেকেই হিন্দুদের এই প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। সে ব্রাহ্মণ বলে তারা তার কথা মেনে নিয়েছিল। যদি কোনো মুসলমান একই কথা বলত, তারা মানত না। সংস্কার আসতে হয় ভেতর থেকে; বাইরে থেকে চাপিয়ে দিলে সেটা হয় না। এই কারণেই বলি, সত্য ব্যানার্জী একটা ছোটখাটো বিপ্লব ঘটিয়েছিল। কিন্তু সে তো একেবারে অখ্যাত নায়ক। তার কোনো রেকর্ড নেই, কোথাও নাম নেই।

ই. ই.:

সেই কারণেই তো আমরা ঘটনাটা এখানে রেকর্ড করে রাখছি।

সা. আ.:

কিন্তু আমার জীবনে সত্য সবসময় একজন নায়ক হিসেবেই থাকবে। ওহ, আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছি, সত্য নিজেকে বেয়ারাদের কাছে এভাবেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, “তোমরা শোনো, আমার নাম সত্য ব্যানার্জী। আমি কালীঘাটের ব্রাহ্মণ।” এভাবেই সে শুরু করেছিল, আর কালীঘাট তো একটা রক্ষণশীল জায়গা। সে বলেছিল, “আমি তোমাদের বলছি, আমি লক্ষ্য করেছি, তোমাদের এই আচরণের কারণেই পাকিস্তানের দাবি উঠেছে।” এইভাবেই সে কথাটা বলেছিল। এসব ঘটনার সামগ্রিক প্রভাব ছিল খুব গভীর। এরপরের গল্পটাও প্রায় একই ধারার।

ই. ই.:

সেই সময় আপনার চিন্তাভাবনার মধ্যে সুশোভন সরকার কোথায় জায়গা করে নিয়েছিলেন?

সা. আ.:

সুশোভন? আমরা জানতাম তিনি কংগ্রেসকে সমর্থন করতেন।

ই. ই.:

জি।

সা. আ.:

তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ শিক্ষক। তিনি দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন না। তার নিজের মতামত ছিল, কিন্তু তিনি আমাদের মত প্রকাশের সুযোগ দিতেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন বুদ্ধিজীবী; তার এই উদারতা এবং মহানুভবতা ছিল অনন্য।

ই. ই.:

আপনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কবে বের হলেন?

সা. আ.:

আমি রাজনীতিতে এতটাই জড়িয়ে পড়েছিলাম যে আমাকে শ্রমিক ফ্রন্টে কাজ করতে বলা হলো। সেই কারণেই তখন শেখ মুজিবকে আমি চিনতাম না। কিন্তু জহুর তার খুব কাছের ছিল। শেখ মুজিব, ফজলুল কাদের চৌধুরী—এঁদের সঙ্গে জহুরের খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। আর আমার কাজ ছিল শ্রমিক ফ্রন্টে। তাই ওই দিকের মানুষদের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। সত্য ব্যানার্জী আমাকে শ্রমিক আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়। সেটা ছিল এক ধরনের মজদুর ইউনিয়ন, যেটা একজন কংগ্রেস নেতার প্রভাবাধীন ছিল, নামটা এখন ভুলে গেছি, মনে পড়ছে না; একজন বিখ্যাত ব্যারিস্টার ছিলেন।

ই. ই.:

আপনার কি তখন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল?

সা. আ.:

না, না, তখন নয়, আরও অনেক পরে। তখন আমি পুরোদস্তুর শ্রমিক নেতা হিসেবে কাজ করেছি। আমি মজদুর ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম।

ই. ই.:

মজদুর ইউনিয়ন?

সা. আ.:

হ্যাঁ। পরে আমাকে পোর্ট ইউনিয়নেও কাজ করতে হয়।

ই. ই.:

কলকাতা পোর্ট?

সা. আ.:

হ্যাঁ, কলকাতা পোর্টে। সেখানে দুটো ইউনিয়ন ছিল। একটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে। আরেকটা ছিল মিশ্র ধরনের, সেখানে সব ধরনের মানুষ ছিল। উদারপন্থী অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরও যুক্ত ছিলেন; আর ছিলেন মৈত্রেয়ী বসু। তারা কংগ্রেসপন্থী, উদারপন্থী মানুষ ছিলেন, কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। আমি একদিন দেখেছি, হুমায়ুন কবিরও এসেছিলেন। কিন্তু আমরা অন্য দিক দিয়ে কাজ করতাম। তখন আমরা আমাদের পরিচয় প্রকাশ করিনি। কাজ করতাম, আবার নিজের পড়াশোনাও চালাতাম। কাজ করতে করতে অনেক সময় ছুটোছুটি করতে হতো।

ই. ই.:

তাহলে আপনি ছাত্র থাকা অবস্থাতেই এসব করছিলেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ।

ই. ই.:

প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়?

সা. আ.:

না, তখন আমি সবে পাস করে বেরিয়েছি।

ই. ই.:

সেটা কোন বছর?

সা. আ.:

এটা ১৯৪৫ সালের কথা। তো আমি যেটা বলতে চাইছি, ম্যাট্রিকুলেশনে আমি ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলাম। কিন্তু তারপর রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। ভালো রেজাল্ট করেছিলাম, কিন্তু বাড়িতে পড়াশোনার ব্যাপারে খুব চাপ ছিল। এইটা এখনো মনে হয় যে, একজন শিক্ষক আমার বাবাকে বলছিলেন, “চিন্তা করবেন না, ছেলেটা খুব ভালো, হয়তো পড়াশোনায় তেমন ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি।” তখন আমার মনে হতো, আমি একদিক দিয়ে হয়তো কিছু হারিয়েছি, কিন্তু অন্যদিক দিয়ে অনেক কিছু অর্জনও করেছি। এভাবে আমি একরকম ভিন্ন মানুষ হয়ে উঠলাম।

ই. ই.:

তারপর ১৯৪৬ সালে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ ঘটল, সেই সময়ের কাছাকাছি?

সা. আ.:

ওই সময় আমি রাজনীতি ছেড়ে দিই এবং ইন্ডিয়ান রেড ক্রস সোসাইটিতে যোগ দিই। তার আগে, ১৯৪৫ সালে, আমি বেঙ্গল পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলাম। তখন আমি সদ্য এম.এ. পাস করেছি। তখনো কলকাতার দাঙ্গা হয়নি। তখন রজনী মুখার্জী ছিলেন নেতা। আমি তাঁদের বলেছিলাম, পাকিস্তানের দাবি ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পর খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার আগে কিন্তু পাকিস্তানের অবস্থান এতটা শক্ত ছিল না। হিন্দুরা ধরে নিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সবকিছু তাদের পক্ষেই থাকবে। এত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড হবে, সেটা আমরা বুঝতেই পারিনি। তার আগে পাকিস্তান বলতে মূলত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব বোঝানো হতো। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলা আর আসাম মিলে একটা আলাদা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হবে এবং বাংলা ভাগ হবে না। কিন্তু যখন কলকাতায় দাঙ্গা হলো, তখন আমিও বলতে শুরু করলাম, “এদের সঙ্গে আর থাকা যাবে না।” ঘটনাগুলো মানুষকে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলল। তার আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না।

তখন পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফে একটা কৌশল নেওয়া হলো। পশ্চিমবঙ্গে পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফের বেশির ভাগ কর্মী ছিল ‘হোয়াইট-কলার’ ইঞ্জিনিয়ার লোকজন। কলকাতার আলিপুরে পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফের একটা বড় কারখানা ছিল। সেখানকার ৯৯ শতাংশ কর্মচারীই ছিল হিন্দু। তখন মুসলমান কর্মী তেমন ছিল না।

রজনীদা বললেন, সরকার নাকি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পুরো কারখানাটা সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাবে। তখন রজনীদা বললেন, “দেখো, সালাহ্উদ্দীনকে যদি সেক্রেটারি বানাও, একজন তরুণ মুসলিমকে যদি সেক্রেটারি করো, তাহলে সে গিয়ে মুসলিম সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবে। বলতে পারবে, পাকিস্তান আসছে; তাই পাকিস্তান থেকে এই কারখানা সরানো উচিত হবে না।” বিষয়টা বুঝতে পারছেন তো?

ই. ই.:

হা হা, এটা তো খুব ভালো আইডিয়া ছিল। খুব তীক্ষ্ণ চিন্তা।

সা. আ.:

বুঝলেন তো?

ই. ই.:

হ্যাঁ, এটা একটা নতুন পদক্ষেপ হবে, এই ধারণাটা কাজ করবে।

সা. আ.:

আমি নেহাতই ভাগ্যক্রমে নির্বাচিত হয়ে গেলাম। ২০ বা ২১ বছরের একজন তরুণ, সদ্য এম.এ. পাস করেছে, সরকারি চাকরি না করে শ্রমিক রাজনীতি করছে; সে একেবারে কাকতালীয়ভাবে ইউনিয়নের সেক্রেটারি হয়ে গেল।

ই. ই.:

খুবই মজার ঘটনা।

সা. আ.:

তারপর আমি দিল্লি গেলাম। দিল্লিতে তারা একজন ইঞ্জিনিয়ারকে আমার সঙ্গে দিল; নাম ছিল লাহিড়ী। তার কাজ ছিল হিন্দু সদস্যদের বোঝানো, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের। এখানে একটা টুইস্ট আছে, বুঝতে পারছেন তো? লাহিড়ী চৌধুরী কেন্দ্রীয় সদস্যদের বলবেন, যদি বাংলাদেশিরা কলকাতা ছেড়ে চলে যায়, তাহলে আমাদেরই ক্ষতি হবে। আমাদের বাড়িঘর কলকাতায়, আমরা কোথায় যাব?

আর আমার মাধ্যমে আবুল আহমদ সিদ্দিকী ও এ. কে. গাঙ্গুলীর মতো কমিটির সদস্যদের বোঝানো হয় যে পাকিস্তান তৈরি হচ্ছে, তাই কারখানা সরানো উচিত নয়। এ. কে. গাঙ্গুলী পরে আই.সি.এস. কর্মকর্তা হয়েছিলেন। এইভাবে আমরা বিষয়টা এগোলাম। সেটা কাজও করেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটা আর হলো না।

যাই হোক, পরে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার আগে আমার বাবা খুলনায় এস.ডি.ও. ছিলেন। তখন আমি সমাজকল্যাণমূলক একটা চাকরি করছিলাম। বাবা একদিন এসে বললেন, “আমি তোমায় ইন্ডিয়ান রেড ক্রস সোসাইটির কথা বলেছিলাম... তুমি যেহেতু সমাজকল্যাণের কাজ করেছ, তোমার নিশ্চয়ই এতে আগ্রহ আছে।” আমি বললাম, ঠিক আছে। তখন তাদের অফিস ছিল গভর্নমেন্ট হাউসের পাশে। সেখানে বেশিরভাগই ছিলেন খুব বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। ইন্ডিয়ান রেড ক্রস সোসাইটির অফিসের সামনে ব্রিটিশ-আমেরিকানদের একটা দপ্তরও ছিল। তো আমি সেখানে গেলাম। বাবার দিক থেকেও একটা ব্যাপার ছিল, আবার তারাও চাইছিল একজন মুসলমান তরুণকে নিতে। তখনো দাঙ্গা হয়নি, তাই বিষয়টা নিয়ে কেউ খুব সন্দেহপ্রবণ ছিল না। আমাকে সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচিত করা হলো। কাজটা আমি উপভোগও করছিলাম। তারপর আমি দেখলাম, সেটাও অনেক দীর্ঘ গল্প। অত কিছু বলা যাবে না।

ই. ই.:

না, না, বলুন।

সা. আ.:

একটা ঘটনা আছে। শুনুন, সেটা বলার চেয়ে জহুর হোসেন চৌধুরী যে দাঙ্গার ঘটনাটা লিখেছিলেন, সেটা নিয়ে বলি।

ই. ই.:

ঠিক আছে। তাহলে আমরা আরেকটু এগোতে পারি। আপনার বই থেকে একটি বিষয় জানতে পেরেছি যে ১৯৪৮ সালে এম. এন. রায় ঢাকায় এসেছিলেন।

সা. আ.:

হ্যাঁ, ৪৮ সালে।

ই. ই.:

সম্ভবত একটি বা দুটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আমার ধারণা, আপনি সেগুলোর অন্তত একটিতে উপস্থিত ছিলেন। আপনি কি এ বিষয়ে আমাদের একটু বলবেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ, বলছি। তখন দেশভাগ হয়ে গেছে। একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার যে আমি এম. এন. রায়ের অন্ধ অনুসারী ছিলাম না। কিছু বিষয়ে তার সঙ্গে আমার মতবিরোধও ছিল। যেমন, আমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করেছিলাম। সুশোভন সরকারের কাছ থেকে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখেছিলাম, জনপ্রিয়তা আর প্রগতিশীলতা এক জিনিস নয়। আপনি হয়তো ব্যাপক সমর্থন পেয়ে জনপ্রিয় হতে পারেন, কিন্তু তার মানেই এই নয় যে সেটা কোনো বিপ্লব। পাকিস্তান ধারণার প্রকৃত বিষয়বস্তু কী ছিল, সেটাও দেখতে হবে। এম. এন. রায় বলেছিলেন, অধিকাংশ মানুষ যখন পাকিস্তান চাইছে, তখন তাদের সেটা পেতে দেওয়া উচিত। যা-ই হোক, মুসলিম মনস্তত্ত্ব তো ওরা জানত না! আমার মনে হতো, মুসলিম মানসিকতার মধ্যে এক ধরনের গোষ্ঠী বা গোত্রকেন্দ্রিক প্রবণতা রয়েছে। মানুষ যতই মেধাবী হোক না কেন, মানসিকতার মধ্যে ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’-র বিভাজন থেকে যায়। কোরআনে আছে না, “আমরা আর তারা”? কারণ মুসলিম সমাজ কখনোই বিজ্ঞান থেকে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা নিতে পারেনি। তো যা-ই হোক, আমি যে কথাটা বলছিলাম। এখন ১৯৪৮ সালের প্রসঙ্গে আসি। আমরা এখানে চলে এলাম। কেন এলাম? প্রথমত, আমি মনে করেছিলাম, আমি আমার নিজের দেশেই ফিরে আসছি। তখনও আমার বিয়ে হয়নি, তবে আমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। পরে ১৯৪৯ সালে আমাদের বিয়ে হয়। দেশভাগের মধ্যে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, যেহেতু ফিরে এসেছি, আমাদের নিজেদের বাড়িতেই যাওয়া উচিত। আর কোথায়ই-বা যাব? দ্বিতীয়ত, এম. এন. রায় বলতেন, আমাদের সমাজে একটা স্পষ্ট রূপরেখা থাকা উচিত। তিনি বলছিলেন, “যেহেতু তোমাদের দেশভাগ হয়েই গেছে, চলো এবার এটাকে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করা যাক।”

ই. ই.:

ঠিক।

সা. আ.:

আমার মনে হয়েছিল, এখানে হয়তো আমরা কিছু করতে পারব। যাই হোক, আপনি এম. এন. রায়ের বক্তৃতার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি আজগর আলী শাহের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন। আজগর আলী শাহ এ বিষয়ে খুবই আগ্রহী ছিলেন।

ই. ই.:

আজগর আলী শাহ?

সা. আ.:

হ্যাঁ, আজগর আলী শাহ। তিনি ছিলেন পাঞ্জাবি আই.সি.এস. কর্মকর্তা। এখনকার সময়ে বিষয়টি হয়তো একটু অকল্পনীয় মনে হবে। আজগর আলী শাহ ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী। তখন সোহরাওয়ার্দী মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। জানেন তো, সোহরাওয়ার্দী এমন একজন রাজনীতিক ছিলেন যিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করতেন, কিন্তু তার মনটা ছিল বেশ উদার। তিনি কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশের শিষ্য হিসেবে, একজন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে। সোহরাওয়ার্দীর যুক্তি ছিল, মুসলমানদের আলাদাভাবে সংগঠিত করতে হবে। কারণ দুটো অসম গোষ্ঠীর মধ্যে কখনো বন্ধুত্ব হতে পারে না। তাই মুসলমানদের আগে সেই পর্যায়ে তুলে আনতে হবে, তারপর দুই সমকক্ষ গোষ্ঠী পরস্পর মিলতে পারবে।

ই. ই.:

ঠিক।

সা. আ.:

এই চিন্তা থেকেই তারা মুসলমানদের আলাদাভাবে সংগঠিত করেছিলেন। কিন্তু এর পরিণতি কী হতে পারে, সেটা তারা তখন বুঝতে পারেননি। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পর সোহরাওয়ার্দী বিষয়টি উপলব্ধি করেন। দাঙ্গার পর অনেক কিছুরই রূপান্তর হয়ে যায়। আজগর আলী শাহের মধ্যেও পাকিস্তানকে ঘিরে নতুন এক উদ্দীপনা ছিল। তাঁদের ভিশন অনুযায়ী একটা নতুন রাষ্ট্র তৈরি হবে, যেটা আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এই ধারণা তখন অনেকের মধ্যেই ছিল।

তো এম. এন. রায় যখন ঢাকায় এলেন, তখন এখানে ভালো হোটেল বলতে তেমন কিছু ছিল না। আমি তখন গেন্ডারিয়ায় থাকতাম।

ই. ই.:

তিনি কলকাতা থেকে এসেছিলেন?

সা. আ.:

হ্যাঁ, কলকাতা থেকে এসেছিলেন। আমি তখনও বেকার, চাকরি খুঁজছিলাম। অবশ্য কয়েক মাস পর একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। জ্যোতির্ময় আর আমি তখন খুব সক্রিয় ছিলাম।

এম. এন. রায় উঠেছিলেন রমনা রেস্ট হাউসে। রমনা টেলিগ্রাফ অফিসের কাছে, পুরানা পল্টনের মোড়ে জায়গাটা ছিল। এখনো আছে কি না জানি না।

ই. ই.:

টেলিগ্রাফ অফিস?

সা. আ.:

হ্যাঁ, পুরানা পল্টনের মোড়ের কাছে।

ই. ই.:

এখন মনে হয় অন্য কিছু হয়ে গেছে...

সা. আ.:

সেখানে একটি দোতলা ভবন ছিল, রমনা রেস্ট হাউস। তখন সেটিই ছিল ঢাকার একমাত্র মোটামুটি সম্মানজনক হোটেল। ভবনটি দোতলা ছিল এবং খাবারের ব্যবস্থাও মোটামুটি ভালো ছিল। আশপাশে ছিল ব্রিটানিয়া কোম্পানির একটি অফিস, সিনেমা হল এবং কিছু খোলা জায়গা। সিদ্ধান্ত হলো, এম. এন. রায় সেখানেই উঠবেন আর তিন দিন থাকবেন এবং তিনটি বক্তৃতা দেবেন। প্রথম বক্তৃতাটি ছিল বার লাইব্রেরির উদ্যোগে। ঠিক হলো, সেই সভায় সভাপতিত্ব করবেন ইতরাত হোসেন জুবেরী—আই. এইচ. জুবেরী।

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

তিনি প্রথমে ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও হয়েছিলেন।

ই. ই.:

হ্যাঁ, হ্যাঁ—জুবেরী হল।

সা. আ.:

হ্যাঁ, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। কিছুদিন পর তিনি ঢাকায় এলেন। তিনি বেশ কৌশলী ও ধুরন্ধর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ থাকার সময় শেখ মুজিবুর রহমান তার ছাত্র ছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছিল যে এখানে এলে তাঁকে ডিপিআই (DPI) করা হবে। আমাদের সময় তো প্রেসিডেন্সি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল...

ই. ই.:

ডিপিআই বলতে?

সা. আ.:

ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন। এটি ছিল খুবই উচ্চপদ। শিক্ষা প্রশাসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। ড. কুদরাত-এ-খুদার কথাও এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে... যাই হোক। ড. জুবেরী ছিলেন খুবই চতুর মানুষ। আমার দায়িত্ব ছিল এম. এন. রায়কে দেখভাল করা। তাঁদের একটি অস্টিন গাড়ি ছিল। সেটা নিয়ে আমি গেলাম।

ই. ই.:

শিবনারায়ণ রায়ও তো ছিলেন।

সা. আ.:

হ্যাঁ, এম. এন. রায়ের সঙ্গে শিবনারায়ণ রায় ছিলেন, আর রায়ের স্ত্রী এলেন রায় ছিলেন। এই তিনজনকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার। গাড়িটা আমার ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল। তো আমি যখন পৌঁছালাম, তখন দেখি জ্যোতির্ময় সভার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। সভাটি হচ্ছিল আদালত ভবনের কাছে বার লাইব্রেরিতে। সেখান থেকে একটি চিরকুট এলো—মহা মুশকিল! ড. জুবেরীর নাকি পেটের অসুখ হয়েছে! এখন কী করা যায়? কে সভাপতিত্ব করবে? আসলে উনি তো বুঝতে পেরেছিলেন, তাই ভয় পেয়ে শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। তখন এম. এন. রায় আমাকে বললেন, “কী সালাহ্উদ্দীন, কী ব্যাপার?” আমি বললাম, “বড় মুশকিল হয়ে গেল, উনি তো আর সভাপতিত্ব করবেন না।” তখন এম. এন. রায় বললেন, “তাহলে তুই প্রিসাইড করবি!”

আমি তো অবাক, “আমি? সেটা কী করে হয়! আমি কীভাবে প্রিসাইড করব?” তিনি বললেন, “তা নাহলে কে করবে?” আমি বললাম, “না, আমি পারব না, আপনি করবেন।” তারপর তিনি ধমক দিয়ে বললেন, “তুই-ই করবি।” তারপর আর কিছু বলার সুযোগ রইল না। ৬ ফুটের মতো লম্বা মানুষ, কালো রঙের চেহারা, আমি তো ভয়ে কাঁপছি, কী করব! কোনো উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত বললাম, “ঠিক আছে, চলুন।” আমি তখনো ভেবে পাইনি যে আমি কী করব! যেতে যেতে হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। ভাবলাম, আমার যা বলার, এম. এন. রায়ের বক্তৃতার আগেই বলে দেব। হলভর্তি মানুষ। মঞ্চে তিনটি আসন—এম. এন. রায়, জ্যোতির্ময় এবং আমি। শিবনারায়ণ রায় ও অন্যরা সামনের সারিতে বসলেন।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “একজন মহান মানুষের সান্নিধ্যে এলে আপনিও... মানে আমারও তেমন অবস্থা।”

তখন আমি ঠিক করে ফেলছিলাম যে এম. এন. রায় একজন অসাধারণ মানুষ, পরিস্থিতিটিও অসাধারণ, আর আমিও আজ একটি অসাধারণ কাজ করতে যাচ্ছি। সাধারণত কোনো সভার সভাপতি সবার শেষে বক্তব্য দেন। কিন্তু এম. এন. রায় যেহেতু সাধারণ মানুষ নন, তাই এই অসাধারণ পরিস্থিতিতে আমিও একটু ব্যতিক্রমী কাজ করব। আমি যা বলার আগেই বলে নেব। কারণ এম. এন. রায় বক্তৃতা দেওয়ার পর আমার আর কিছু বলার থাকবে না।

ই. ই.:

ঠিক।

সা. আ.:

আমি বললাম যে তার বিপ্লবী সাথীরা তাঁকে একজন দার্শনিক হিসেবে মানতেন। আমি এভাবেই বললাম। তখন তো আমি রেনেসাঁস সাহিত্যের বইটই পড়তাম, তাই ওই অল্প কথায় গুছিয়ে বলেছিলাম। পরে শুনেছি, এম. এন. রায় নাকি বলেছিলেন, ছেলেটি ভালো বলেছে। যাই হোক, এটি ছিল প্রথম সভা। এরপর দ্বিতীয় সভা হলো।

ই. ই.:

ঐ সভায় এম. এন. রায় কি নতুন বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলেছিলেন?

সা. আ.:

না, বিশেষ কিছু নয়।

ই. ই.:

পাকিস্তানের প্রেক্ষাপট নিয়ে?

সা. আ.:

হ্যাঁ, তিনি সাধারণভাবে বলেছিলেন, আমাদের একটা নতুন জাগরণ হয়েছে, এখন দেশকে গড়ে তুলতে হবে এবং আমাদের দায়িত্ব কী, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। মানে বিপ্লবী কোনো কথা তিনি বলেননি। বরং খুব গঠনমূলকভাবে কথা বলেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশের শীর্ষস্থানীয় আমলারাই তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তাই তিনি খুব কূটনৈতিক ও সংযতভাবে বক্তব্য দিয়েছিলেন।

এরপর সম্ভবত তৃতীয় দিনে আমরা গেলাম এস. এম. হলে।

ই. ই.:

স্যার সলিমুল্লাহ হল।

সা. আ.:

হ্যাঁ, এখন নামটা মনে পড়েছে। সেখানে মুসলমানদের ইতিহাস নিয়ে কথা হয়েছিল। আমাদের ঐতিহাসিক শিকড় এবং মুতাজিলা চিন্তাবিদদের কথাও এসেছিল, যাঁরা আবেগের চেয়ে যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এম. এন. রায় ইতিহাসের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আপনাকে সত্যবাদী, সৎ এবং ভালো মানুষ হতে হবে, এই কারণে নয় যে খোদা আপনাকে তা হতে বলেছেন; বরং এই কারণে যে, ভালো মানুষ হওয়ার মধ্যে আপনি একটা আনন্দ খুঁজে পান।

কথাটি আমার এখনো মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, আমাদের ভালো হওয়ার অনুপ্রেরণা পাওয়া উচিত আমাদের ভেতর থেকে; কেউ আমাদের ভালো হতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে নয়, কারণ নৈতিকতা ও যুক্তিবোধ প্রতিটি মানুষের মাঝেই সহজাতভাবে রয়েছে।

সেদিন আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। তখন একটু শীতকাল ছিল। জানুয়ারি মাস। এরপর আমরা ঢাকা ক্লাবে গেলাম। আজগর আলী শাহ আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এম. এন. রায়সহ আমরা ছয়জন ছিলাম। এম. এন. রায় জ্যোতির্ময়কে বললেন, “তোর বন্ধুকে নিয়ে আয়।” আমাদের মধ্যে ছিলাম আমি, জ্যোতির্ময়, হাবিবুর রহমান, সৈয়দ হোসেন ও আলী মোহাম্মদ ইউনুস। দেশের আরও কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি সেখানে ছিলেন।

মাহমুদ হাসানকে চেনেন? তিনি পরে উপাচার্য হয়েছিলেন।

ই. ই.:

মাহমুদ হাসান?

সা. আ.:

হ্যাঁ, মাহমুদ হাসান।

ই. ই.:

না।

সা. আ.:

তিনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন।

ই. ই.:

আচ্ছা।

সা. আ.:

সেখানে আরও অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। ফজলে করিম ছিলেন একজন আই.সি.এস. কর্মকর্তা। আজগর আলী শাহ তো ছিলেনই। স্বরাষ্ট্রসচিব আফসারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমরা বসে গল্প করছিলাম। আফসার লোকটি খুব একটা বুদ্ধিমান ছিলেন না। সে তখন স্বরাষ্ট্রসচিব, তো সে ভাবল নিজের ক্ষমতা জাহির করবে। সে এম. এন. রায়কে বলে বসল, “মিস্টার রায়, আপনি যা বলেছেন, তা শুনতে ভালো। কিন্তু এসব কথা প্রচার করে আপনি ক্ষমতা দখল করতে পারবেন না।”

মানে সে পুরো অন্য লাইনে চলে গেল! কথাটা শুনে এম. এন. রায় যেন সম্পূর্ণ বদলে গেলেন। আমি দেখলাম, তিনি আফসারের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “কী বললেন আপনি? ক্ষমতা দখল? আপনি ক্ষমতায় আছেন বলেই ক্ষমতা হারানোর ভয় পাচ্ছেন। আপনি কেন মনে করেন, প্রত্যেক মানুষই আপনার মতো সংকীর্ণ? আপনি সব সময় কেবল ক্ষমতার ভাষায় চিন্তা করেন!” এম. এন. রায় খুব ধীরে, কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কথা বলতেন। তার প্রতিটি শব্দ পরিষ্কার শোনা যেত এবং তার কণ্ঠ ছিল খুবই গুরুগম্ভীর। তিনি বারবার ওই একই কথা রিপিট করতে লাগলেন, “আপনি ক্ষমতায় আছেন বলেই ক্ষমতা হারানোর ভয় পাচ্ছেন।”

সবাই একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর কয়েকজন তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেন—“আপনি কী বলছেন? কাকে কী বলছেন?” কিন্তু এম. এন. রায় যা বলার, বলে দিয়েছিলেন। আফসার পরে গজগজ করতে লাগলেন, “তিনি আমাকে সংকীর্ণ বললেন!”

এম. এন. রায়ের সেই কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজে—

“আপনি ক্ষমতায় আছেন বলেই ক্ষমতা হারানোর ভয় পাচ্ছেন। আপনি কেন মনে করেন, প্রত্যেক মানুষই আপনার মতো সংকীর্ণ? আপনি সব সময় ক্ষমতার ভাষাতেই চিন্তা করেন।”

যাই হোক, পরের দিন এম. এন. রায় ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন।


Comments


bottom of page